বান্দরবানের অদম্য ইমতিয়াজ: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এইচএসসিতে সাফল্য
বান্দরবানের অদম্য ইমতিয়াজ: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এইচএসসিতে সাফল্য
সুকেল তঞ্চঙ্গ্যা, বান্দরবান:
চোখে দৃষ্টিশক্তি নেই, তবুও স্বপ্ন পূরণের অদম্য প্রত্যয় আর মনের আলোয় এগিয়ে চলেছেন বান্দরবানের তরুণ মোহাম্মদ ইমতিয়াজুল ইসলাম। জীবনের সব প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবার বান্দরবান সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা ২০২৬-এ জিপিএ ৪.৫০ অর্জন করেছেন তিনি। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, বরং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অপার সম্ভাবনা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল ও অনন্য দৃষ্টান্ত।
ইমতিয়াজের শিক্ষা জীবনের শুরুটা হয়েছিল বান্দরবান ইসলামিয়া শিক্ষাকেন্দ্র থেকে। সেখানে থেকে তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে পড়াশোনা করে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে জিপিএ ৫.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হন এই মেধাবী শিক্ষার্থী। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকেও সব বাধা দূর করে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৬১ অর্জন করে উচ্চমাধ্যমিকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান। সর্বশেষ বান্দরবান সরকারি কলেজ থেকে নানা প্রতিকূলতা ও শ্রুতিলেখকসংক্রান্ত জটিলতা উপেক্ষা করে এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৫০ অর্জন করে নিজের মেধার স্বাক্ষর পুন রায় বজায় রাখেন।
খুব ছোটবেলায়, মাত্র আট মাস বয়সে বিরল এক রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিজের দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করেন ইমতিয়াজ। একপর্যায়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁর দুটি চোখই অস্ত্রোপচার করে অপসারণ করতে হয়। শৈশবেই পৃথিবী চিরতরে অন্ধকার হয়ে গেলেও এই নির্মম সত্য তাঁর পড়াশোনার স্পৃহাকে একটুও দমাতে পারেনি। বরং অদম্য মনোবল নিয়ে তিনি পবিত্র কোরআনের হাফেজ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এবং পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার মূলধারায় নিজেকে সমানভাবে এগিয়ে নেন।
এইচএসসি পরীক্ষার প্রাক্কালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নীতিমালা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে পরীক্ষার সময় শ্রুতিলেখক পাওয়া নিয়ে তৈরি হয় চরম শঙ্কা। এমন সংকটময় মুহূর্তে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন বান্দরবান পৌর প্রশাসক মোঃ এস এম মনজুরুল হক ও বান্দরবানের স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘আল-ফারুক ইনস্টিটিউট’। প্রতিষ্ঠানটির আন্তরিক সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত শ্রুতিলেখক পাওয়ার ব্যবস্থা হয় এবং তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ছিনিয়ে আনেন। পাশাপাশি তিনি বান্দরবান পৌরসভা কর্তৃক আয়োজিত “বান্দরবান পৌরসভা শিক্ষা মেধাবৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫” এ অংশগ্রহণ করে জেলা সদরের বিভিন্ন নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে পিছনে ফেলে তিনি বান্দরবান সরকারি কলেজের হয়ে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে প্রথম স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থী মোঃ ইমতিয়াজ।
শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাতেই নয়, প্রযুক্তি জগতেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এই তরুণ তুর্কি। আধুনিক সহায়ক প্রযুক্তি ও স্ক্রিন রিডারের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন দক্ষ অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ও ব্যাক-এন্ড ডেভেলপার হিসেবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ করা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের মহৎ উদ্দেশ্যে তিনি ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছেন, যা প্রযুক্তি অঙ্গনে তাঁর মেধার পরিচয় বহন করে।
ইমতিয়াজের এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর পরিবারের অসামান্য অবদান, বিশেষ করে তাঁর মমতাময়ী মায়ের নিরলস পরিশ্রম, অকৃত্রিম ত্যাগ ও নিরবচ্ছিন্ন অনুপ্রেরণা। যিনি দিনরাত এক করে ছেলের পাশে থেকেছেন, পড়ার বই পড়ে শুনিয়েছেন এবং প্রতিটা পদক্ষেপে পথ দেখিয়েছেন। মা ও পরিবারের পরম ছায়া আর নিজের প্রবল আত্মবিশ্বাসই ইমতিয়াজকে আজকের এই গৌরবের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানকে আরও প্রসারিত করতে চান ইমতিয়াজ। তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
ইমতিয়াজের মতে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো মানুষের বড় স্বপ্ন পূরণের অন্তরায় হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন শুধু যথাযথ সুযোগ, সামাজিক সহযোগিতা এবং একটি সহায়ক পরিবেশ। তাঁর এই ঐতিহাসিক অর্জন আবারও প্রমাণ করে দিল—চোখের আলো না থাকলেও মেধার দীপ্তি, অদম্য মনোবল এবং কঠোর অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো মানুষই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন
Array