প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফর ঘিরে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশায় মুখর জনপদ।
এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী
সরকার গঠনের পর আগামীকাল প্রথমবারের মতো এক দিনের সফরে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সফরকে ঘিরে পুরো জেলাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও আশার সঞ্চার।
শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদে প্রধানমন্ত্রীর আগমন কেবল একটি রাজনৈতিক সফর নয়, বরং এটি কক্সবাজারের সামগ্রিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের এক নতুন দিগন্তের সূচনা। তাঁর এই সফরকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের আকাশ-বাতাস মুখরিত, মানুষের হৃদয়ে তৈরি হয়েছে নতুন স্বপ্নের দোলাচল।
এই জনপদের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও পরিবর্তনের পর, রাষ্ট্রনায়ক ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কক্সবাজার আগমন এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তারেক রহমান তার পিতার আদর্শ ও উন্নয়নের সেই ধারাবাহিকতাকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন তার এই প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে সরাসরি পাতলী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করবেন, তখন তা শহীদ জিয়ার স্মৃতি ও আদর্শের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে প্রতিফলিত হবে । আমি একজন জনপ্রতিনিধি তথা আমজনতার দীর্ঘদিনের নির্বাচিত খাদেম হিসাবে মাননীয় প্রধনমন্ত্রী বরাবর কক্সবাজারবাসীর প্রধান সমস্যা সমুহ সদয় বিবেচনার জন্য আজকের লেখায় আলোকপাত করছি।
১. কক্সবাজারবাসীর প্রধান সমস্যা হলো রোহিঙ্গা সংকট
ক. নিরাপদ প্রত্যাবাসন: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।
খ. নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার ও আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধিঃওআইসিভুক্ত দেশ, আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক সংস্থা এবং তুরস্কের মতো বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে চাপ বৃদ্ধি করা।
গ. স্থানীয়দের সুরক্ষায় রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগার নির্মাণ ও রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ বন্ধ চাই।
ঘ নাফ নদীর মোহনা হতে অস্ত্র ধারী ও ইয়াবা কারবারী রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে হবে।
ঙ. রোহিঙ্গাদের শ্রমও ব্যবসা বন্ধ করতে হবে।
চ. রোহিঙ্গাদের বরাদ্দের ২৫% রোহিঙ্গা বসবাস রত উখিয়া টেকনাফের বাইরে দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
ছ. উখিয়া টেকনাফের জনগণের জন্য আরো ৫০ হাজার ভিজিডি (মাসিক ৩০ কেজি চাউল) ভিডব্লিউবি বরাদ্দ চাই।
জ. রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার চাই।
ঝ. রোহিঙ্গা বর্জ্যে দিয়ে উখিয়া টেকনাফের ভরাট কৃত খাল পুনঃ খনন ও সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবসা চাই।
ঞ. রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্তানরত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য রোহিঙ্গাদের দেওয়া বরাদ্ধের সমপরিমান ত্রান চাই।
ক্রমবর্ধনশীল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উন্নত নাগরিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করার দাবি দীর্ঘদিন ধরে চলে
২. কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশন করার জোর দাবী
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ই”ছায় ও সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনায় বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের এই পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারকে একটি পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি করে, এবং দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে সিটি করপোরেশন গঠন করা সর্বাধিক কার্যকর।
অবিলম্বে কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্যটন নগরীতে পনিত করার জোর দাবী জানাচ্ছি”।
৩. পর্যটন খাতের টেকসই উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন
ক. পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও সুরক্ষা: কক্সবাজার সৈকত এবং মেরিন ড্রাইভের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সৈকতের ভাঙন রোধে স্থাযী প্রকল্প গ্রহণ।
খ. আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন জোন: কক্সবাজারকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে রূপান্তর করতে সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
গ. পর্যটক নিরাপত্তা ও বিনোদন: সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক বিনোদন ব্যবসার সম্প্রসারণ।
ঘ. সেন্টমার্টিনের পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত লক্ষাধিক মানুষের রুটি-রুজির কথা বিবেচনা করে, পরিবেশ ধ্বংস না করে, বরং পরিবেশবান্ধব নিয়মকানুন কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত ও রাত্রিযাপনের আগের নিয়মটি পুনর্বহাল করতে হবে।
৪. অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যোগাযোগ ব্যবসার আধুনিকায়ন
ক. সড়ক ও রেল যোগাযোগ: চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা।
৫. আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরাসরি ফ্লাইট চালু করা।
৬. মহেশখালী-চকরিয়াতে আদালত আছে, উখিয়া-টেকনাফে আদালত চাই।
৭. টেকনাফ হতে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম পযর্ন্ত রাস্তা সড়ককে ৬ লাইনে উন্নত করা।
৮.স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি
ক. ট্যাক্স ফ্রি অর্থনৈতিক জোন: পর্যটন ও স্থানীয় পণ্যের বাজার প্রসারে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন বা শুল্কমুক্ত বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলা।
খ. কোটা ব্যবস্থা: কক্সবাজারে চলমান মেগা প্রকল্প এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় শিক্ষিত বেকারদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
৯. সুপেয় পানি ও পরিবেশ সংরক্ষণ
ক. সুপেয় পানির সংকট নিরসন: দীর্ঘদিনের ভূগর্ভ¯’ পানির সংকট দূর করতে কেন্দ্রীয় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিক করা।
খ. পরিবেশ রক্ষা: মেরিন ড্রাইভসহ পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধ করা।
১০. স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন
ক. কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: স্থানীয় ও পর্যটকদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিকীকরণ করা।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২৫০ থেকে ৫০০-তে উন্নীত করার জন্যজোরালো দাবি জানাচ্ছি” । প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের (স্থানীয় বাসিন্দা, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা ও পর্যটক) জন্য এই শয্যা সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল।
১১. শিক্ষা খাতের উন্নয়ন
ক.উচচশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ: কক্সবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। পর্যটন ও অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ এই জেলায় উ”চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য সরকারের কাছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন।
খ.উখিয়া বাসীর প্রানের দাবী উখিয়া কলেজ সরকারী করন করা।
১২. লবণ ও শুঁটকি শিল্পের বিকাশ
ক. কৃষকদের ন্যায্যমূল্য: দেশীয় লবণ চাষিদের সুরক্ষায় বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বন্ধ করা এবং চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান।
খ. শুঁটকি রপ্তানি: ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পকে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি।
১৩. নীল অর্থনীতির বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্পদকে টেকসই উন্নয়নের আওতায় আনতে হবে
ক. গভীর সমুদ্রবন্দর ও মেরিন ড্রাইভ: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ চালু করা এবং মেরিন ড্রাইভ সড়ককে টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্লু-ইকোনমি করিডোর গড়ে তোলা।
খ. সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ: আধুনিক ট্রলার এবং মৎস্য আহরণ প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো, সাগরে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং সাগরে হারিয়ে যাওয়া জেলেদের উদ্ধারে দ্রুতগতির উদ্ধারকারী জাহাজ মোতায়েন করা।
গ. জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্প : কক্সবাজারের উপকূলবর্তী এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের শিপ রিসাইক্লিং ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং জোন গড়ে তোলা, যা সুনীল অর্থনীতিতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
ঘ. বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ঊত): সামুদ্রিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কক্সবাজার ও মহেশখালী এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। সুনীল অর্থনীতির এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু কক্সবাজার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক নতুন উ”চতায় নিয়ে যাবে।
১৪. মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু বাস্তবায়নের দাবি
মহেশখালীতে চলমান গভীর সমুদ্র বন্দর এবং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পের কারণে এই অঞ্চলের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে মূল ভূখণ্ডের সাথে বিচিছন্নতার কারণে দ্বীপবাসীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় ।
১৫. মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ না করে বরং মহেশখালীতে অবাধে প্যারাবন ধ্বংসের মহোৎসব কারীদের কঠোর শাস্তির জোর দাবী।
কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের ঘটিভাঙ্গা এলাকায় চিংড়ি ঘের, লবনের মাঠ ও জমি দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঢাল হিসাবে খ্যাত প্যারাবন কেটে ও আগুন লাগিয়ে বিরান ভূমিতে পরিণত করা হচেছ।
প্যারাবন নিধনকারী অপরাধীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করা ও বনভূমি ধ্বংসের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্যারাবনগুলো সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা।
লেখক: মহাসচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি,সিনিয়র সহ সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম ও চেয়ারম্যান পালং খালী ইউপি, উখিয়া, কক্সবাজার।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬ । ৯:৪০ অপরাহ্ণ