ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অসম্মানী ভাতা ও জামানতের জুলুম

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৭:৪৭ অপরাহ্ণ

ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অসম্মানী ভাতা ও জামানতের জুলুম

এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী:

 

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো তৃণমূল পর্যায়। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চাবিকাঠি নিহিত থাকে তার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশন—এই স্তরগুলো সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এক চরম বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের দীর্ঘদিনের দাবি—সম্মানী ভাতা বৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে, নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথকে সংকুচিত করতে প্রার্থীর জামানতের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বাংলা প্রবাদের সেই রূঢ় সত্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়—‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’। অর্থাৎ, অধিকার বা সুযোগ দেওয়ার যোগ্যতা ও সদিচ্ছা না থাকলেও, দায়িত্ব চাপানো এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্তাব্যক্তিদের উৎসাহের কোনো কমতি নেই।

 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভার মাঠপর্যায়ে দিনরাত কাজ করা এই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যে মাসিক সুযোগ-সুবিধা বা সম্মানী দেওয়া হয়, তা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য এবং এক প্রকার ‘অসম্মানী’র শামিল। অথচ রাষ্ট্রে মন্ত্রী, এমপি, রাষ্ট্রপতি এবং সরকারি আমলাদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রতিনিয়ত আকাশচুম্বী করা হচ্ছে। এই চরম প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য কোনোভাবেই কাম্য নয়।

 

স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের বাস্তব অবস্থা

 

একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য হলেন গ্রামীণ জনপদের প্রধান ভরসাস্থল। গভীর রাতে কোনো বাড়িতে চুরি হলে, পারিবারিক সহিংসতা ঘটলে কিংবা আকস্মিক দুর্যোগ দেখা দিলে গ্রামবাসী সবার আগে মেম্বার-চেয়ারম্যানের দরজায় কড়া নাড়ে। সরকারি ত্রাণ বিতরণ, রাস্তাঘাট সংস্কার, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, সালিশ-বিচার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সব মৌলিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করেন এই জনপ্রতিনিধিরা।

 

অথচ, এই বিপুল দায়িত্বের বিপরীতে তাদের যে আর্থিক সম্মানী দেওয়া হয়, তা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় চরম প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। একজন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) মাসে যে সামান্য সরকারি ভাতা পান, তা দিয়ে বর্তমান যুগে একটি সাধারণ পরিবারের কয়েক দিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচও মেটানো সম্ভব নয়। সম্মানী ভাতার এই ঘাটতির কারণে অনেক সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি মাঠপর্যায়ে রাজনীতিতে আসতে দ্বিধাবোধ করেন। অথচ রাষ্ট্র তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন।

 

সম্মানী বৃদ্ধির উদাসীনতা বনাম অর্থনৈতিক বাস্তবতা

 

বিগত বছরগুলোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন স্কেল কয়েক গুণ বেড়েছে। দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের মহার্ঘ ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। তাদের সম্মানী বাড়ানোর ফাইল আমলাতান্ত্রিক জটিলতার লাল ফিতায় বন্দি হয়ে থাকে।

 

বর্তমান বাজারে যেখানে চাল, ডাল, তেলসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, সেখানে একজন জনপ্রতিনিধিকে নামমাত্র সম্মানীতে ২৪ ঘণ্টা জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকতে বাধ্য করা এক ধরনের রাষ্ট্রীয় শোষণ। সম্মানীর এই অপ্রতুলতার কারণে অনেক সময় জনপ্রতিনিধিদের পরোক্ষভাবে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। রাষ্ট্র যখন তাদের জীবনযাত্রার ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা করে না, তখন ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই’—এই বাক্যটিই চরমভাবে সত্য হয়ে ওঠে।

 

জামানত বৃদ্ধির প্রস্তাব: নির্বাচনী ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ

 

জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কোনো নামগন্ধ না থাকলেও, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের টাকা এক লাফে কয়েক গুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। যুক্তি দেওয়া হয়, নির্বাচনে ‘অপেশাদার’ বা ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রার্থীর সংখ্যা কমাতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু এটি আসলে একটি অগণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত।

 

জামানত বৃদ্ধির এই প্রবণতা তৃণমূলের রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে বিত্তশালীদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাবে। গ্রামীণ জনপদে অনেক সৎ, ত্যাগী এবং জনগণের প্রিয় সমাজসেবক রয়েছেন, যাদের আর্থিক সচ্ছলতা নেই কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করার প্রবল সদিচ্ছা রয়েছে। জামানতের অঙ্ক আকাশচুম্বী হলে এই সৎ মানুষগুলো নির্বাচনের মাঠে নামার সাহসই পাবেন না। ফলে স্থানীয় নির্বাচনগুলো কেবল কোটিপতি, কালো টাকার মালিক এবং পেশিশক্তিধারীদের একচেটিয়া খেলার মাঠে পরিণত হবে।

 

‘কিল মারার গোঁসাই’ মানসিকতার প্রতিফলন

 

সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়ে কেবল কড়াকড়ি আর আর্থিক বোঝা চাপানোর এই নীতিই হলো ‘কিল মারার গোঁসাই’ মানসিকতা। রাষ্ট্র জনপ্রতিনিধিদের কাজের মূল্যায়ন করবে না, তাদের সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেবে না, কিন্তু তাদের ওপর নিয়মের বেড়াজাল আর খরচের বোঝা ঠিকই চাপিয়ে দেবে।

 

যদি কোনো প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড়াতেই বিপুল অঙ্কের টাকা জামানত দিতে হয়, তবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রধান লক্ষ্যই থাকবে যেকোনো উপায়ে সেই নির্বাচনী খরচ এবং জামানতের টাকা সুদে-আসলে উসুল করা। এর ফলে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতি আরও জ্যামিতিক হারে বাড়বে। টিআর, কাবিখা, বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার কার্ড বিতরণে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষের লেনদেন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে। কর্তারা আইন করে জামানত বাড়াচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এর পরোক্ষ চাবুকটি গিয়ে পড়বে সাধারণ জনগণের পিঠেই।

 

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

 

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো সমতা। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এবং নির্বাচিত হওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। জামানত বৃদ্ধির এই প্রস্তাব মূলত দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক কর্মীদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে ফেলার এক সুক্ষ্ম চক্রান্ত। এটি দেশের সংবিধান নির্দেশিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। যখন অর্থই যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে গণতন্ত্রের বদলে ‘ধনিকতন্ত্র’ বা ‘প্লুটোক্রেসি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এই ধনিকতন্ত্রের প্রবেশ ঘটলে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে।

 

করণীয় ও উত্তরণের পথ

 

এই আত্মঘাতী নীতি থেকে সরে এসে রাষ্ট্রকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণমুখী নীতি গ্রহণ করতে হবে:

 

১. সম্মানী পুনর্বিন্যাস: বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের জনপ্রতিনিধিদের সম্মানী ভাতা সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে।

 

২. জামানত যৌক্তিকীকরণ: জামানতের পরিমাণ এমন পর্যায়ে রাখতে হবে যেন কোনো সৎ ও যোগ্য নাগরিক আর্থিক অনটনের কারণে প্রার্থী হওয়া থেকে বঞ্চিত না হন।

 

৩. কাঠামোগত সংস্কার: স্থানীয় সরকারকে সত্যিকারের স্বাধীন ও স্বাবলম্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নিজস্ব আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে এবং আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কমে।

 

৪. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের কাজের কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

 

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে জনপ্রতিনিধিদের পেটে খিদে রেখে তাদের কাছ থেকে সততা আশা করা বোকামি। ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ’ না দেখিয়ে কেবল ‘কিল মারার’ নীতি গ্রহণ করলে তৃণমূলের রাজনীতিতে সৎ মানুষের আকাল দেখা দেবে। কালো টাকা আর পেশিশক্তির দাপটে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই সুশাসনের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকারকে এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। জামানত বৃদ্ধির জুলুম বন্ধ করে জনপ্রতিনিধিদের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হওয়াই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

আমরা বিশ্বাস করি, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের ভোটাধিকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকবে। তাই সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামানত বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি। জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের উত্থাপিত দাবিসমূহ দ্রুত বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

লেখক: মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব, সিনিয়র সহ-সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার।

সম্পাদক : মো আসমত হোসেন , নির্বাহী সম্পাদক : শহিদুজ্জামান হক ।  কপিরাইট © দৈনিক বাংলা নিউজ ,সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন