বান্দরবানের থানচিতে প্রবারণায় চালের ডিও বিক্রির টাকা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান:
বান্দরবানের থানচি উপজেলায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বরাদ্দকৃত চালের ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) বিক্রি করে প্রাপ্ত নগদ টাকা বিতরণে চরম বৈষম্য ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বরাদ্দের সমপরিমাণ অর্থ পেলেও অনেক বিহারকে নির্ধারিত অঙ্কের চেয়ে কম টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট বিহারের অধ্যক্ষরা। কোথাও কোথাও বরাদ্দের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কেও পরিচালনা কমিটিকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ও অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রবারণা পূর্ণিমা ও শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন উপলক্ষে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় থানচি উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ৮১টি বৌদ্ধবিহার এবং ২টি শারদীয় দুর্গামন্দিরসহ মোট ৮৩টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪৯ দশমিক ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাওয়ার কথা ছিল ৬০০ কেজি করে চাল। গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিও হস্তান্তর কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. শরিফুল ও রুবেল জানান, ডিও বিতরণের দিন রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা রনি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা উপস্থিত থেকে মোট ৭৯টি ডিও নিয়ে যান। এর মধ্যে রেমাক্রী ও তিন্দু ইউনিয়নের ৩৪টি এবং থানচি সদর ও বলিপাড়া ইউনিয়নের ৪৫টি ডিও ছিল। পরে এসব ডিও ডিলারের কাছে বিক্রি করে নগদ টাকায় রূপান্তর করা হয়। তবে বাকি ৪টি ডিও মৈত্রী শিশু সদন, করুণা শিশু সদন ও ২টি দুর্গামন্দিরের প্রতিনিধিরা সরাসরি গ্রহণ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ডিও বিতরণের দিন থেকে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও খাদ্যগুদামের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনুপস্থিতির কারণে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি গুদাম থেকে চাল উত্তোলন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
রেমাক্রী ইউনিয়নের ক্যবু পাড়া বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উ. অগ্রবংশ ভিক্ষু, রেমাক্রী বাজার বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উ. সুচিত্ত্বা মহাথেরো এবং কোয়াইক্ষ্যং পাড়া বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উ. পয়ঞাজতা ভিক্ষু জানান, চেয়ারম্যান ও মন্ত্রীর প্রতিনিধি তাঁদের জানান যে প্রতি কেজি চাল ৩৬ টাকা দরে ৬০০ কেজির ডিও বিক্রি করে মোট ২১ হাজার ৬০০ টাকা পাওয়া গেছে।
ক্যাং পরিচালনা কমিটির সম্মতি নিয়ে প্রশাসনিক খরচ বাবদ ১ হাজার টাকা এবং উপজেলা যুব সম্প্রদায়ের প্রবারণা উৎসব পরিচালনা কমিটির জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা কেটে রাখার কথা বলা হয়। এতে মোট আড়াই হাজার টাকা বাদ দিয়ে ১৯ হাজার ১০০ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে বিহারের অধ্যক্ষদের হাতে তুলে দেওয়া হয় মাত্র ১৫ হাজার টাকা করে।
বিহারের অধ্যক্ষরা ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও জানান, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিহারগুলোর নামে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও তাঁরা বিষয়টি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না। এত বছর ধরে চেয়ারম্যানরা তাঁদের নিজস্ব তহবিল থেকে ৫ হাজার টাকা করে অনুদান দিচ্ছেন বলেই তাঁরা জেনে এসেছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরাদ্দের তালিকায় নাম থাকলেও রেমাক্রী ইউনিয়নের চাইহ্লাউ পাড়া, ক্রাহ্লাঅং পাড়া এবং তিন্দু ইউনিয়নের সাউপ্রু পাড়া, ওয়েলাওয়া পাড়া ও ছাংওডং পাড়াসহ কয়েকটি মারমা-অধ্যুষিত গ্রামে বাস্তবে কোনো বৌদ্ধবিহার বা ভিক্ষু নেই। বিহারহীন এসব গ্রামের নাম কীভাবে সরকারি বরাদ্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগের বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা জানান, তিনি পিআইও কার্যালয় থেকে ৪৫টি ডিও নিয়ে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে বিক্রি করেছেন এবং প্রতিটি বিহারের অধ্যক্ষের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়ে টাকা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
অন্যদিকে, থানচি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মসফিকুর রহমান বলেন, “ইউপি চেয়ারম্যানদের স্বাক্ষর করা ১২০টি বিহারের তালিকা থেকে যাচাই-বাছাই ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর ৮৩টি প্রতিষ্ঠানের জন্য চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। মিলনায়তনে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিদের কাছে ডিও হস্তান্তরের পর তারা নিজেরা কী করেছেন, তা আমাদের জানা নেই। তবে অফিস খরচের নামে কোনো টাকা কাটার সিদ্ধান্ত ছিল না। যদি কোনো কর্মচারী এ ধরনের টাকা নিয়ে থাকেন, তবে তা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে এবং টাকা কম দেওয়ার অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিহারগুলোর পরিচালনা কমিটি অবিলম্বে তদন্ত সাপেক্ষে চাল বরাদ্দের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ