সাতকানিয়ায় ইউএনওকে ঘিরে অপপ্রচার, নেপথ্যে কি সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ
সাতকানিয়ায় ইউএনওকে ঘিরে অপপ্রচার, নেপথ্যে কি সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ
সাতকানিয়া চট্টগ্রাম প্রতিনিধি :
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের দায়িত্ব পালনকাল নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রচারণা ও অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা বা তদবির রক্ষা না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই স্বার্থান্বেষী মহল এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও সাবেক প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
একজন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে সমালোচনা বা ভিন্নমত থাকতেই পারে। তবে নিয়মনীতি ও সরকারি বিধিবিধানের কারণে কোনো প্রভাবশালী মহলের আবদার বা সুপারিশ প্রত্যাখ্যাত হলে তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নানা ধরনের প্রচারণা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সাতকানিয়ায় দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রভাবশালী মহল থেকে নানা সুপারিশ এলেও ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান তা সব সময় গ্রহণ করেননি। বিশেষ করে বন্যা মোকাবিলা, ত্রাণ বিতরণ, উপজেলা ক্রীড়া কমিটি গঠন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং টিউবওয়েল বরাদ্দের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা দলীয় সুপারিশের চেয়ে প্রশাসনিক নিয়মকে প্রাধান্য দেওয়ায় একটি সুবিধাভোগী মহলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়।
সাতকানিয়ায় ভয়াবহ বন্যার সময় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমেও বিভিন্ন পক্ষের চাপ ছিল। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে নিয়ম অনুযায়ী ত্রাণ বিতরণের অবস্থান নেওয়ায় প্রশাসন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দলীয় কর্মীদের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রাখেনি। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পেয়ে একটি পক্ষ প্রশাসনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়। এছাড়া স্থানীয় এক সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতি পরিচয়ে দুই ধাপে ৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও চাল নেওয়ার পর আরও ত্রাণের বাড়তি চাহিদা প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ত্রাণ বিতরণের রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা জরুরি।
উপজেলা ক্রীড়া কমিটি গঠন নিয়েও স্থানীয় মহলের সঙ্গে প্রশাসনের মতবিরোধ দেখা দেয়। একটি বিতর্কিত ব্যক্তিকে কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়নের প্রস্তাব প্রশাসন কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় অসন্তোষ আরও বাড়ে। পাশাপাশি, অবৈধ মাটি-বালু ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তদবির উপেক্ষা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ায় স্বার্থান্বেষী মহলটি আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
সাবেক প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে লিপ্ত কিছু ব্যক্তি ও নামধারী সাংবাদিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব গুজব ও অপপ্রচারে অংশ নিয়েছেন। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও লেনদেনের তথ্য ছাড়া এ ধরনের গুরুতর অভিযোগকে একপেশেভাবে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া সমীচীন নয়।
সাতকানিয়ায় ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির জটিল সময়ে ইউএনও এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলা, ভূমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর মাঠপর্যায়ের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বিদায়লগ্নে তাঁর একটি বক্তব্য—“আমি যদি সাতকানিয়ায় না আসতাম, অনেক কিছুই আমার অজানা থেকে যেত। এমনকি একটি গোষ্ঠীর চেহারা সম্পর্কেও অজানা থেকে যেতাম”—নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা চললেও একে কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখা যায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা এই ধারাবাহিক প্রচারণা কি গঠনমূলক সমালোচনা, নাকি সুবিধা না পাওয়ার ক্ষোভ—সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। প্রশাসনের কোনো কার্যক্রমে অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যেমন প্রমাণের সাপেক্ষে খতিয়ে দেখা উচিত, তেমনি ব্যক্তিগত আক্রোশ বা স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হলেও তা জনস্বার্থেই উন্মোচন করা প্রয়োজন।
আবেগ বা সামাজিক মাধ্যমের গুজবের ওপর নির্ভর না করে ত্রাণ বিতরণের তালিকা, উন্নয়ন প্রকল্পের কাগজপত্র, ক্রীড়া কমিটির প্রস্তাব এবং প্রশাসনিক আদেশের মতো দালিলিক প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করাই এখন সবচেয়ে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।


আপনার মতামত লিখুন
Array