পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের সংবাদ সম্মেলন।
নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান:
পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের দেশের একটি ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল। যেখানে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বহুভাষিক ও বৈচিত্র্যময় মানুষ যুগ যুগ ধরে বাস করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এখানকার জননিরাপত্তা, সাধারণ মানুষের জীবিকা এবং মানবাধিকার চরম হুমকির মুখে পড়েছে। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একপাক্ষিক ও আংশিক তথ্য প্রচার করে প্রকৃত নিরাপত্তাহীনতার চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে পার্বত্য অঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষের অভিজ্ঞতা, বস্তুনিষ্ঠ উপাত্ত এবং সঠিক বাস্তবতাকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতেই আমাদের এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, এই সময়ে প্রায় ২৪০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪৭টি অপহরণ এবং ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অপহরণের শিকার হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাধারণ শ্রমিক, চালক, কৃষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রামবাসী পর্যন্ত। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৮টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে। আমাদের অনুসন্ধানের উঠে এসেছে জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস), ইউপিডিএফ(প্রসীত), কেএনএফ নামক পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র ৭০ জনেরও বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও তরুণকে জোরপূর্বক সশস্ত্র সংঘাত বা দলীয় কাজে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে ১৪ জন নারী অপহরণ, প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যা নারী ও শিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রধান আর্থিক উৎসে পরিণত হয়েছে অবৈধ চাঁদাবাজি ও মুক্তিপণ আদায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র গত এক বছরে প্রায় ১,৫২০টি চাঁদাবাজির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি- জনপ্রতি প্রায় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। প্রতিটি ওষুধ কোম্পানির ক্ষেত্রে এই অংক ২ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং পরিবেশক কোম্পানিগুলোর কাছে ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। এমনকি স্থানীয় জিপ, পরিবহন বা যানবাহনের ক্ষেত্রে যানভেদে প্রতি গাড়ি থেকে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো লক্ষ্য করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। গত ৩১ মার্চ রাঙ্গামাটি শহরের আসামবস্তি এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উন্নয়নকাজে নিয়োজিত ৫ জন শ্রমিককে মারধর করে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় এবং সাথে থাকা সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৩ এপ্রিল বান্দরবান সদরে একটি ট্রাক আটকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। ৮ এপ্রিল বান্দরবানের রেনিখ্যং বাগানপাড়া এলাকায় আম ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করার সময় স্থানীয়রা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা প্রতিরোধ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের থেকে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা বা তারও বেশি পর্যন্ত অর্থ চাদাবাজি ও মুক্তিরপণ হিসেবে আদায় করছে আঞ্চলিক উপজাতি সন্ত্রাসী বাহিনী গুলো।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভূমি দখল ও দখলচেষ্টার ৪টি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ২৭-৩০ মে ২০২৬ খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার মলঙ্গীপাড়া এলাকায় একজন বাগান মালিকের প্রায় ২০ একর পাহাড়ি জায়গা জবরদখল করে রাতারাতি ঘর নির্মাণ করে ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ)। ২৩ মার্চ ২০২৬ বান্দরবানের লামা উপজেলার মিরিঞ্জা এলাকায় ‘জঙ্গল বিলাস’ নামক রিসোর্ট দখলের উদ্দেশ্যে দলবল নিয়ে হামলা করে জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) সদস্যরা। এ সময় রিসোর্টের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও জায়গাটি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এক পর্যায়ে অনিক ত্রিপুরা ৩ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।
জেএসএস ও ইউপিডএফ এর মতন পাহাড়ের আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠন গুলো সরকার, সেনাবাহিনী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীবিরোধী অপতথ্য প্রচারের মাধ্যমে “জুম্মল্যান্ড”নামে একটি পৃথক প্রদেশ এবং রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, বিদেশী সরকার এবং প্রবাসী গোষ্ঠীর সহানুভূতি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজেদের তথাকথিত “নিপীড়িত” হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এসব অপতথ্য ছড়িয়ে তারা বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা বা কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করছে। একই সঙ্গে নিজেদের চাঁদাবাজি, অস্ত্র চোরাচালান বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে আড়াল করতে সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক বাস্তবতা, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পরিবহনের অভিযোগ, প্রবাসভিত্তিক সাংগঠনিক তৎপরতা, ভূমি বিরোধ, তথ্যপ্রবাহ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধার সঙ্গে তা বহুমাত্রিকভাবে সম্পর্কিত। এসব বিষয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবন, নিরাপত্তা, সম্পত্তি, জীবিকা, চলাচল, যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি এবং উন্নয়নের অধিকারের ওপর এসে পড়ে।
আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক ও অস্ত্র পাচার-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো পার্বত্য অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, সশস্ত্র সহিংসতার ধারাবাহিকতা এবং সংঘাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নির্দেশ করে। প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে অবস্থান, প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক কার্যালয় পরিচালনা অথবা অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহের যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত গুরুতর।
সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক পাচার, মাইন স্থাপন, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় তরুণদের সংঘাতমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ জননিরাপত্তার পাশাপাশি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এসব কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার ফলে তরুণেরা জীবনহানি, আটক, বিচার, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী বিস্ফোরক, চোরাচালান, সংঘর্ষ এবং প্রতিশোধমূলক সহিংসতার আশঙ্কার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হতে পারে।
এই সামগ্রিক চিত্র প্রমাণ করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি স্থানীয় সশস্ত্র দলগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবিকা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিক্ষা এবং সার্বিক সামাজিক জীবনকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অর্থ আদায় এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ওপর দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।
জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৬ সময়কালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, অপহরণ, জিম্মিকরণ, মুক্তিপণ দাবি, হত্যা, সশস্ত্র সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক নিয়োগ, শিশু ও তরুণদের সংঘাতমুখী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার, নারীর প্রতি সহিংসতা, ভূমি দখল, আন্তঃসীমান্ত অস্ত্র ও মাদক পাচারের অভিযোগ, বিভ্রান্তিকর তথ্যপ্রচার এবং সরকারি-বেসরকারি উন্নয়নকাজে বাধা সাধারণ মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা, সম্পত্তি, শিক্ষা, জীবিকা, যোগাযোগ ও উন্নয়নের অধিকারকে বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়নে কেবল আইনশৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নয়, বরং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সুরক্ষা, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত, বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ, নারী ও শিশুর বিশেষ সুরক্ষা, স্বাক্ষী ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, অবৈধ অস্ত্র ও অপরাধভিত্তিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ, ভূমি বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল তথ্যপ্রচারের ভারসাম্য এবং নিরাপদ, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
সুতরাং আমরা মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, আস্থা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব হবে, যখন সকল নাগরিকের জীবন, মর্যাদা, নিরাপত্তা, সমঅধিকার, উন্নয়নের সুযোগ এবং আইনের সমান সুরক্ষা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হবে।
পরিশেষে, আমরা প্রত্যাশা করি, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি ও বাঙালি সকলের মাঝে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমঅধিকারের ভিত্তিতে সম্প্রীতি বিরাজ করবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলেই হৃদয়ে ধারণ করবে “লাল-সবুজের পতাকা।
আপনার মতামত লিখুন
Array