প্রধান মন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা: পার্বত্য অঞ্চলে ইটভাটা করতে দেয়া হবেনা, পার্বত্যমন্ত্রী
প্রধান মন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা: পার্বত্য অঞ্চলে ইটভাটা করতে দেয়া হবেনা, পার্বত্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
বান্দরবান পার্বত্য জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স ছাড়াই ইটভাটা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে অধিকাংশ ইটভাটায় পাহাড়ের কাছাকাছি স্থাপনা তৈরি করে পাহাড় কেটে ইট তৈরির মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে তা সরেজমিনে গিয়ে দেখা গিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে ফাইতং ইউনিয়নে স্থিত ৩২ টি ইটভটার মধ্যে ৮টি ইটভাটাকে নিয়মিত মামলার আওতায় আনা হয়েছে, বাকি ২৪ টি ইটভাটাকে নামমাত্র মোবাইল কোর্টে জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে। ইটভাটা মালিকরা বলেন এতে করে বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। কয়েকজন ইটভাটা মালিক বলেন, আমাদের ইটভাটাকে নিয়মিত মামলার আওতায় আনা হয়েছে। আমরা যেমন অপরাধ করেছি পাহাড় কেটে ও লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা পরিচালনা করে, অন্যান্য ইটভাটা মালিকরা ও একই অপরাধ করেছে,তাহলে তাদের বেলায় কেন প্রশাসন এত সহনশীলতা দেখাচ্ছে?
অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই এসব ইটভাটা বছরের পর বছর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে গত ৮ সেপ্টেম্বর
গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূইয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আদেশ জারি করেন
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ১৫ অনুযায়ী ৭ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ৩০ দিনের মধ্যে বান্দরবান জেলা প্রাশাসনকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা যায় লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের পাগলীর আগা নামক স্থানে কয়েকটি ইটভাটার বিরুদ্ধে পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
জানা যায়, পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬খ ধারা, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে ১২ ধারা, লাইসেন্স ছাড়া ইট প্রস্তুত ও ভাটা পরিচালনার ক্ষেত্রে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩-এর ৪ ধারা এবং নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পরিবেশ-মানবাধিকার ও গণমাধ্যমকর্মী রুহুল আমিন বলেন,এসব ধারায় নিয়মিত মামলা হলে অভিযুক্ত ইটভাটাগুলোর মালিকদের বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। এতে করে সরকারি কোষাগারে আদায়কৃত জরিমানার অর্থ জমা হলে,সরকার বা দেশ আংশিক হলেও অর্থনৈতিক ভাবে বলিষ্ট হবে বলে মনে করেন। অপরদিকে নিয়মিত মামলা দায়েরের ফলে অপরাধ সংশ্লিষ্ট ইটভাটা মালিকরা পাহাড় কর্তন ও ইটভাটা চালু করার প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকবেন বলে জানিয়েছেন।
লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের পরিবেশ কর্মী ফরহাদ সজল জানান, ইটভাটার বিরুদ্ধে সবগুলো প্রযোজ্য ধারায় নিয়মিত মামলা না করে কেবল পাহাড় কাটার অভিযোগে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তুলনামূলক নামমাত্র জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা আদায় একধরনের লোক দেখানো প্রক্রিয়া মাত্র। ইটভাটা মালিক রা উপজেলা প্রশাসন ও বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তর কে প্রতিবছর ম্যানেজ করে পাহাড় কর্তন ও ইটভাটা চালু রেখেছে বলে অভিযোগ জানিয়েছেন।
লামা উপজেলা প্রেসক্লাবের সিনিয়র যুগ্ন সম্পাদক ও কলামিষ্ট জিটিভি’র বিশেষ প্রতিনিধি ফরিদ উদ্দিন বলেন,লামা উপজেলার একটি ছোট্ট ইউনিয়নে ৩২ টি ইটভাটার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। প্রতিটি ইটভাটাকে নিয়মিত মামলার আওতায় না আনা হলে, পাহাড় কর্তনের মত পরিবেশের ধংশযজ্ঞ বন্ধ করা সম্ভব হবেনা বলে জানিয়েছেন।
ফাইতং ইউনিয়নের সমাজ সেবক ও রাজনৈতিক কর্মী আলী হায়দার মানিক জানান বিশেষ করে ২০২৫-২০২৬ ইটভাটা মৌসুমে লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে পরিচালিত প্রায় ৩২টি ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর ও পূর্ণাঙ্গ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা আদায় করে কার্যক্রম শেষ করার অভিযোগ উঠেছে। এতে ইটভাটা মালিকরা বড় ধরনের আইনগত ও আর্থিক দায় থেকে রেহাই পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোপনীয় রাখার শর্তে অনুসন্ধানে জানতে পারি কয়েকজন ইটভাটা মালিক থেকে, যে সকল ইটভাটাকে নিয়মিত মামলার আওতায় আনা হয়নি, তাদের কাছ থেকে ২,৫০,০০০ টাকা করে প্রতিটি ইটভাটা থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছে।পরিবেশ অধিদপ্তরকে যে সকল ইটভাটা মালিকরা ম্যানেজ করতে পেরেছে, তাদের ইটভাটা গুলোকে শুধুমাত্র মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা করা হচ্ছে।যারা ম্যানেজ করতে পারেনি তাদের ইটভাটাকে নিয়মিত মামলার আওতায় আনা হয়েছে।
অভিযোগের তীর সহকারী পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, বান্দরবান, ইন্সপেক্টর নুরউদ্দিন বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তর, এবং পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চল এর দিকেও স্পষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, কোনো ইটভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স না থাকলে শুধু পাহাড় কাটার অপরাধে জরিমানা আদায় করেই দায় শেষ করার সুযোগ নেই। পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীনভাবে ইটভাটা স্থাপন, লাইসেন্স ছাড়া ইট প্রস্তুত এবং নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা স্থাপনের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট সব ধারায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তর সরাসরি নিয়মিত মামলা করলে ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। কিন্তু পরিবর্তে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে জরিমানা আদায় করায় ইটভাটাগুলো কার্যত আবারও একইভাবে পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে।
পরিবেশবাদীদের মতে বিষয়টি শুধু পাহাড় কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়! এর সঙ্গে পরিবেশ ধ্বংস, পাহাড়ি ভূমির স্থিতিশীলতা নষ্ট জমির শ্রেণী পরুবর্তন, বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং আইন অমান্য করে ইটভাটা পরিচালনার বিষয়ও জড়িত।
একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা উৎকোচ গ্রহণ ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তর এর উপ-পরিচালক নুর হাসান সজিব এর সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে , তিনি এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন। ৮টি ইটভাটাকে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে বাকি ২৪ টা ইটভাটাকে কেন শুধুমাত্র মোবাইল কোর্ট জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথমত আমাদের লোকবল কম তাই ধাপে ধাপে সবকয়টি ইটভাটাকে মামলার আওতাশ আনা হবে বলে জানিয়েছেন।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক মোঃ সানিউল ফেরদৌস বলেন,অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কর্তন ঠেকানো শুধুমাত্র প্রশাসনের কাজ নয়। স্থানীয় লোকজন ও জন-প্রতিনিধিদের ও আন্তরিক হতে হবে এবং অভিযোগ লিখে পাঠাতে হবে। নিয়মিত মামলা দায়েরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়মিত মামলা দায়ের এইটা পরিবেশ অধিদপ্তর এর এক্তিয়ার ভূক্ত কাজ। জেলা প্রশাসক এর উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইউএনও অভিযোগের ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে থাকেন।
চলতি ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে লামায় ইটভাটা চালুর রাখার সম্ভাবনা আছে কি, প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা রয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলে কোন ইটভাটা আর চালু করতে দেওয়া হবেনা।


আপনার মতামত লিখুন
Array