খুঁজুন
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ই-পেপার |
ads

ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:২৮ অপরাহ্ণ
ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়?

ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়?

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিতর্ক যেন আবারও ফিরে এসেছে একটি প্রতীকী জায়গায়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায়।

 

সংস্কারের পর ১৩ সেপ্টেম্বর ডাকসুর আর্কাইভটি খুলে দেওয়া হয়। সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন স্থান পায়। এরপরই শুরু হয় প্রতিবাদ। ১৪ সেপ্টেম্বর এক সাবেক শিক্ষার্থী জিন্নাহর দুটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরদিন একদল শিক্ষার্থী ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি রেখে প্রতিবাদ করেন।

 

ঘটনাটি নিছক একটি ছবি রাখা বা সরানোর প্রশ্ন নয়। এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্রদের কি ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখানো হবে, নাকি তাদের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে বাদ দেওয়া হবে?

 

ইতিহাসের নথি মুছে ফেলার মাধ্যমে ইতিহাস বদলায় না। বরং একটি ঐতিহাসিক চরিত্রকে বোঝার জন্য তার বক্তব্য, কর্মকাণ্ড, সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছু একসঙ্গে দেখতে হয়।

 

জিন্নাহর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার প্রশ্ন তার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। কারণ তিনি ১৯৪৮ সালেই মারা যান। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রটি কেমন হবে—বিশেষ করে ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে—তার অবস্থান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা। প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। একই বছর মার্চে ঢাকায় এসে জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর এই অবস্থানের প্রতিবাদ করেছিলেন তৎকালীন শিক্ষার্থীরা। (The Daily Star)

 

এখানে একটি ঐতিহাসিক বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। ১৯৪৮ সালের ভাষার দাবি পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল না। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাংলার স্বীকৃতি চেয়েছিলেন। ছাত্রসমাজের দাবিও ছিল ভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।

 

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দাবি বিস্তৃত হয়েছে। ভাষার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রাম স্বাধীনতার দাবিতে পৌঁছায়।

 

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও ১৯৫২ সালে শুরু হয়নি। ১৯৪৭-৪৮ সাল থেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে তমদ্দুন মজলিশ, ছাত্রসমাজ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের তৎপরতা শুরু হয়। সভা, মিছিল, ধর্মঘট, গ্রেপ্তার ও প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় আন্দোলন ক্রমে শক্তিশালী হয়। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। এই ধারাবাহিকতাই পরবর্তী সময়ে বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

 

অতএব, ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকলে শুধু তাঁর ছবি রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁর ভাষানীতি, ১৯৪৮ সালের রাজনৈতিক অবস্থান এবং তার বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিক্রিয়ার নথিও সেখানে থাকা উচিত। একইভাবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব, ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামের দলিলও থাকা দরকার।

 

একই কথা প্রযোজ্য জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও।

 

১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল—এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি নথিভুক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা। দলটির তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কয়েকজন নেতার ভূমিকা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোতেও আলোচিত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে।

 

তবে এখানে ব্যক্তি, সংগঠন এবং নির্দিষ্ট সময়ের ভূমিকা আলাদা করে দেখা জরুরি। কোনো ব্যক্তির ছবি একটি আর্কাইভে রাখা মানেই তার সব কর্মকাণ্ডের সমর্থন নয়। বরং ঐতিহাসিক সংগ্রহশালার কাজ হওয়া উচিত—কেন তিনি বা সংগঠনটি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কোন অবস্থান নিয়েছিল এবং সেই অবস্থানের পরিণতি কী হয়েছিল—তার প্রমাণ হাজির করা।

 

গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, ১৯৭১ সালের অবস্থান এবং স্বাধীনতার পরবর্তী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এসব বিষয়কে বাদ দিলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হবে; আবার কেবল একটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রতীকে পরিণত করলেও ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।

 

জামায়াতে ইসলামীর ভেতরেও ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা ও ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে—এ তথ্যও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সামনে এসেছে। দলটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর প্রকাশিত স্মৃতিকথা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে দলের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালে এ বিষয়ে একটি খসড়া বিবৃতিও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি।

 

এই তথ্যও ইতিহাসের অংশ। অর্থাৎ ইতিহাস শুধু বাইরের সমালোচনা দিয়ে তৈরি হয় না; একটি সংগঠনের ভেতরের আত্মসমালোচনা, মতবিরোধ এবং সিদ্ধান্তহীনতার নথিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

 

সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতাও এই আলোচনাকে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ২৮টি কেন্দ্রীয় পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায়। ভিপি, জিএস ও এজিএস পদেও তাদের প্রার্থীরা জয়ী হন।

 

এই নির্বাচনী ফল বর্তমান ছাত্ররাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। কিন্তু কোনো নির্বাচনী ফলাফল অতীতের ইতিহাসকে বাতিল করে না। একইভাবে অতীতের কোনো রাজনৈতিক ভূমিকা দিয়ে বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যেক সদস্যের অবস্থান নির্ধারণ করাও সঠিক নয়।

 

তরুণদের কী ভাবতে হবে, কাকে সমর্থন করতে হবে কিংবা কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তা বলে দেওয়ার চেয়ে তাদের সামনে তথ্য ও নথি তুলে দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

তারা জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের বক্তব্য পড়ুক। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব পড়ুক। ভাষা আন্দোলনের নথি ও সে সময়ের সংবাদপত্র দেখুক। ১৯৭১ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রকাশিত বিবৃতি ও প্রচারপত্র পড়ুক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় পড়ুক। আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্কের বিবরণও দেখুক। এরপর তারা নিজেদের মতো করে প্রশ্ন তুলুক এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছাক।

 

ইতিহাসের নথি যত বেশি মানুষের সামনে থাকবে, ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার সুযোগ তত কমবে।

 

এখানেই একটি জাদুঘর বা ঐতিহাসিক আর্কাইভের মূল দায়িত্ব। কোনো সংগ্রহশালা কোনো পক্ষের প্রচারমঞ্চ নয়। আবার কোনো পক্ষের ইতিহাস মুছে ফেলার জায়গাও নয়। সেখানে থাকা উচিত দলিল, ছবি, সংবাদপত্র, বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং ঘটনাপ্রবাহ—যাতে দর্শক নিজেই একটি সময়কে বুঝতে পারেন।

 

ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকবে কি না—এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ছবি থাকলে তার পাশে ইতিহাসটিও থাকবে কি না।

 

জিন্নাহ থাকলে তাঁর ভাষানীতির ইতিহাস থাকবে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত থাকলে তাঁর প্রস্তাব থাকবে। ভাষা আন্দোলনের নথি থাকবে। ২১ ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের ঘটনাও থাকবে। এরপর আসবে ছয় দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ার ঘটনা এবং ১৯৭১ সালের মার্চের সামরিক অভিযান।

 

থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। থাকবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ভূমিকা। যারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল, তাদের ভূমিকা থাকবে; যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের অবস্থানও থাকবে। রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের ভূমিকা নিয়ে যে নথি রয়েছে, সেগুলোও থাকবে।

 

কারণ ইতিহাসকে পছন্দমতো বেছে নেওয়া যায় না।

 

বাংলাদেশের জন্ম কোনো একটি ছবি, কোনো একটি ভাষণ কিংবা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের ফল নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের পরিণতি। ভাষার অধিকার থেকে রাজনৈতিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রাম—এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপ বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।

 

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগও থাকতে পারে। নতুন প্রজন্ম পাকিস্তানের সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি কিংবা অন্যান্য বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে। এসবের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ইতিহাস অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই।

 

রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া আর ইতিহাস ভুলে যাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।

 

বরং অতীত সম্পর্কে সৎ থাকা একটি পরিণত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে। কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রয়োজন যেমন আছে, তেমনি ইতিহাসের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রয়োজনও আছে।

 

ডাকসুর সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু ছবি ছেঁড়া বা ছবি পদদলিত করার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতর দিকটি আড়ালে থেকে যাবে। এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রাখে—আমরা কি ইতিহাসকে আবেগ দিয়ে দেখব, নাকি দলিল দিয়ে বুঝব?

 

ছবি ছিঁড়ে ফেলা ইতিহাসের সমাধান নয়। আবার বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির ছবি রেখে তার রাজনৈতিক ভূমিকা গোপন করাও ইতিহাসচর্চা নয়।

 

ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হলো ইতিহাসের পূর্ণ নথি।

 

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। বাঙালির রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম হয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে, বিপক্ষে কিংবা ভিন্ন অবস্থানে ছিলেন—সেসব অবস্থানেরও নথি রয়েছে।

 

এই সবকিছু মিলেই বাংলাদেশের ইতিহাস।

 

কোনো ছবি সেই ইতিহাস বদলাতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও পারে না। কূটনৈতিক সম্পর্কও পারে না।

 

বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হোক। প্রশ্ন উঠুক। পুরোনো নথি নতুন প্রজন্ম আবার পড়ুক। ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসুক। কিন্তু প্রমাণিত ঘটনাকে বাদ দিয়ে নতুন ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা যেন না হয়।

 

কারণ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস কোনো দেয়ালে ঝোলানো ছবিতে লেখা হয়নি।

 

সেই ইতিহাস লেখা হয়েছে মানুষের ভাষার অধিকারের সংগ্রামে, রাজনৈতিক আন্দোলনে, ভোটে, রক্তে, যুদ্ধে এবং আত্মত্যাগে।

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুদকের অভিযান: এবার কি থামবে অনিয়মের রাজত্ব?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১৬ অপরাহ্ণ
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুদকের অভিযান: এবার কি থামবে অনিয়মের রাজত্ব?

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুদকের অভিযান: এবার কি থামবে অনিয়মের রাজত্ব?

বান্দরবান প্রতিনিধি: সুকেল তঞ্চঙ্গ্যা

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে অবশেষে অভিযানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অভিযানকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি এই জনপদে সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে—তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললেও কি সবকিছু আগের মতোই চলবে, না-কি সত্যিকার অর্থে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বান্দরবান পার্বত্য জেলার সাতটি উপজেলা, দুই পৌরসভা এবং চৌত্রিশটি ইউনিয়নের নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও পাহাড়ি জনপদের মানুষ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কাগজে-কলমে বড় অংকের বরাদ্দ দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তদারকির অভাবকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদার হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা।

এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি বিশেষ দল অধিদপ্তরে অভিযানে নেমে বিভিন্ন নথিপত্র ও প্রকল্পের হিসাবপত্র যাচাই-বাছাই করছেন। দুদক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক অভিযোগের সত্যতা ও সুনির্দিষ্ট অনিয়মের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই আইনগত ভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে সচেতন মহলের আশঙ্কা, অতীতে অনেক দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। ফলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে কি না, নাকি এটিও ধামাচাপা পড়ে যাবে—তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে স্থানীয়রা।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, দুদকের এই জোরালো পদক্ষেপই প্রমাণ করবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কতটা ফলপ্রসূ। পাহাড়ের সাধারণ মানুষের সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করতে এবং সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার দেখতে তারা নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের টানাপোড়েনে বাংলাদেশের কৌশলগত হিসাব

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১২ অপরাহ্ণ
যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের টানাপোড়েনে বাংলাদেশের কৌশলগত হিসাব

যুক্তরাষ্ট্র-চীন-ভারতের টানাপোড়েনে বাংলাদেশের কৌশলগত হিসাব

নিউজ ডেস্ক

বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন একাধিক শক্তির স্বার্থ, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। একই সময়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার পর্যায়ে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো একটি শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া নয়; বরং বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কীভাবে অক্ষুণ্ন রাখা যায়।

 

এই বাস্তবতার সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগ। ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা এসব চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর কয়েক দিন পর, ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এ বিষয়ে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি জানান, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

এই ঘটনাকে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পর্যালোচনার বিষয় হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন মূল্যায়নের একটি ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি এবং ভারতের নিরাপত্তাগত স্বার্থ—সব মিলিয়ে যে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর নতুন মূল্যায়ন। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও নয়াদিল্লির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

ঢাকার ঘোষিত অবস্থান হলো—জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না বাড়িয়ে সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানো হবে; কিন্তু এর বিনিময়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা যাতে সংকুচিত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

 

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই দীর্ঘদিনের মূলনীতি বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে পরীক্ষা দিচ্ছে। কারণ বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশের মতো একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ পুরোপুরি বাইরে থাকতে পারে না। আবার কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে পড়লেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

 

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়িয়ে ক্রমেই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা পেয়েছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’। চুক্তিটি দুই দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং এতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। (The American Presidency Project)

 

ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে শুধু অতীতের রাজনৈতিক চাপের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। রপ্তানি বাজার, শুল্ক, বিনিয়োগ, সরবরাহশৃঙ্খল, প্রযুক্তি ও জ্বালানি—সবকিছুই এখন সম্পর্কটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

এখানে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলা। যুক্তরাষ্ট্র যেমন তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে বাণিজ্যনীতির সঙ্গে যুক্ত করছে, তেমনি বাংলাদেশেরও বাজার, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সুযোগ গ্রহণের সময় দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে।

 

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পরিধিও গত কয়েক বছরে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে।

 

২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এ সম্পর্কের নতুন মাত্রা তুলে ধরে। সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়। দুই দেশের সম্পর্ককে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গঠনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে সম্ভাব্য ‘টু-প্লাস-টু’ সংলাপের বিষয় উঠে এসেছে।

 

মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, যোগাযোগ অবকাঠামো, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও এই সম্পর্কের ব্যাপ্তি বোঝায়।

 

তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিস্তারকে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে যোগদানের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। বরং বাংলাদেশের বর্তমান কৌশলে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট। তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, ঋণ, বন্দর, প্রযুক্তি, জ্বালানি কিংবা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে কি না—তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়।

 

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যাগুলোর একটি হলো বাণিজ্য ভারসাম্য। চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও চীনা বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানো।

 

চীনা বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থায়ন, ঋণের শর্ত, স্থানীয় শিল্পে প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। অর্থাৎ সম্পর্কের গভীরতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নির্ভরতার মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ।

 

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বাস্তবতা আরও জটিল। ভৌগোলিক নৈকট্য, প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, নদীর পানি এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা—সবকিছু মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য অন্য যেকোনো শক্তির চেয়ে ভিন্ন ধরনের অংশীদার।

 

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ভারতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের পাশাপাশি নদীর পানিবণ্টনের বিষয়গুলোও সম্পর্কের আলোচনায় রয়েছে।

 

এই কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অংশ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এ সম্পর্কের নিজস্ব ইতিহাস, পারস্পরিক নির্ভরতা ও দ্বিপক্ষীয় সমস্যা রয়েছে।

 

ভারতের সঙ্গে ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনার উদ্যোগ এই নতুন বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে পর্যালোচনা মানেই সব চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করা হবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বরং সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তিগুলো পরীক্ষা করে অসঙ্গতি বা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো বিষয় থাকলে তা চিহ্নিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে।

 

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত পর্যালোচনার পদ্ধতি। কোনো চুক্তি কোন সরকারের সময়ে হয়েছে—এটি একমাত্র বিবেচনা হতে পারে না। চুক্তির আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক ফলাফল, বাস্তব প্রয়োগ, নিরাপত্তাগত প্রভাব, পারস্পরিক সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ দায়—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

 

ভারতের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত যে বক্তব্য এসেছে, তাতে দিল্লি বলেছে তারা এ বিষয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো যোগাযোগ পায়নি এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এটিকে সরাসরি চুক্তি বাতিলের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেয়ে ভারতের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ রক্ষার অবস্থান হিসেবে দেখা বেশি সংগত।

 

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে অপেক্ষা করছে—গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ভারতের সংসদীয় নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে চুক্তি নবায়ন নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্যেও বর্তমান চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

 

অতএব ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার পাশাপাশি পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো মৌলিক দ্বিপক্ষীয় বিষয়েও বাংলাদেশকে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।

 

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সম্ভাব্য সহযোগিতা যেমন বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যও এর কৌশলগত ও ভৌগোলিক গুরুত্ব রয়েছে।

 

এ ধরনের প্রকল্পে বিদেশি অংশীদার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু অর্থায়ন বা প্রযুক্তির সুবিধা দেখলে চলবে না। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, পরিচালন ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তাগত উদ্বেগ—সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে।

 

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারদর, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থায় যেকোনো বড় পরিবর্তন দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।

 

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ বাড়ানো একটি বিকল্প হতে পারে। তবে তার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহকারী দেশ বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পেতে হবে।

 

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। চীন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদার ও অবকাঠামো সহযোগী। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অংশীদার। ভারতের সঙ্গে রয়েছে স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য এবং সীমান্ত অর্থনীতি।

 

তবে তিন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন এক নয়। তাই একই মাপকাঠিতে তিনটি সম্পর্ককে বিচার না করে খাতভিত্তিক জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

 

যেখানে বাজার দরকার, সেখানে বাজার; যেখানে বিনিয়োগ দরকার, সেখানে বিনিয়োগ; যেখানে প্রযুক্তি প্রয়োজন, সেখানে প্রযুক্তি; আর যেখানে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল—এই পৃথক পদ্ধতিই বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।

 

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সম্ভাব্য নতুন কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোতেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশ্ন উঠলে সেটিকে শুধু মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এ ধরনের কোনো কাঠামো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করতে হবে।

 

অর্থাৎ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যত বাড়বে, ততই প্রয়োজন হবে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান এবং প্রতিটি উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মূল্যায়ন।

 

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন কোনো অবস্থায় নেই যে তাকে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক জোটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বরং বাস্তবতা হলো—একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ, চীনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিস্তার এবং ভারতের নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

 

১০১টি ভারতীয় চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে এর ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে পর্যালোচনার মানদণ্ড, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।

 

বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন কোনো একটি শক্তিকে বেছে নেওয়া নয়। বরং প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের নিজস্ব ক্ষেত্র ও প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাজার ও বিনিয়োগ, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক ও আঞ্চলিক সংযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রের গুরুত্ব আলাদা।

 

জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ সম্পর্ক সংকুচিত করা নয়; বরং এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে সহযোগিতার সুযোগ সর্বোচ্চ হবে কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অযথা সীমিত হবে না।

 

বড় শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি দূরে থাকতে পারবে না। আবার কোনো একটি শক্তির কৌশলগত হিসাবের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়াও দীর্ঘমেয়াদে নতুন নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। তাই প্রয়োজন আবেগনির্ভর অবস্থানের বদলে বাস্তববাদী কূটনীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ চুক্তি, অর্থনৈতিক হিসাব এবং নিরাপত্তাগত মূল্যায়নের সমন্বয়।

 

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হবে—কত বড় শক্তির সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো, তা নয়; বরং বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ন রাখা গেল। এ ভারসাম্যই আগামী দিনের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সফর সংক্ষিপ্ত, কূটনৈতিক কর্মসূচি বিস্তৃত: নিউইয়র্কে তারেক রহমান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৪৯ অপরাহ্ণ
সফর সংক্ষিপ্ত, কূটনৈতিক কর্মসূচি বিস্তৃত: নিউইয়র্কে তারেক রহমান

সফর সংক্ষিপ্ত, কূটনৈতিক কর্মসূচি বিস্তৃত: নিউইয়র্কে তারেক রহমান

নিউজ ডেস্ক

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের দীর্ঘদিনের একটি চিত্র ছিল—বড় বহর, দীর্ঘ সফর, বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয় এবং নানা আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত সময় পার করা। একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বড় সফরসঙ্গী দল, একের পর এক বৈঠক এবং নানা কর্মসূচিকে ঘিরে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও অতীতে আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের ভাষায়, কখনো কখনো জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণের চেয়ে সফরের আনুষ্ঠানিকতা ও বহরের আকারই বড় হয়ে উঠেছিল।

 

এবার সেই প্রচলিত রেওয়াজ থেকে বেরিয়ে আসার বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের জাতিসংঘ সফর রাখা হয়েছে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত ও কর্মসূচিনির্ভর। সফরসঙ্গীর সংখ্যাও প্রয়োজনের মধ্যে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা, অতিরিক্ত সময় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় থাকবে না—এমন একটি বার্তাই সামনে এসেছে।

 

এই পরিবর্তনকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফরের কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্যের পুরোটা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয়সংযম, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রয়োজনের বাইরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় না করার একটি নীতিগত অবস্থানের সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হবে, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে—কিন্তু সেই কাজের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, তার বাইরে কোনো আয়োজন না করার দৃষ্টিভঙ্গিই এবারের সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের শুরুতে সময়সীমা ছিল আরও দীর্ঘ। ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সফরের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নিউইয়র্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অন্য শহরেও যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু পরে সফরসূচি কাটছাঁট করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২৪ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেওয়ার পর দ্রুত দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ অবস্থানের পরিবর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

 

রাষ্ট্রীয় সফরের ক্ষেত্রে সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একজন সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের প্রতিটি দিন মানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, প্রটোকল, যাতায়াত, আবাসন ও অন্যান্য নানা ধরনের ব্যয়। ফলে সফরের সময় যতটা প্রয়োজনের মধ্যে রাখা যায়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ততটাই সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত দেশে ফিরে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন।

 

এবারের সফরের তাৎপর্য এখানেই—বাংলাদেশ বিশ্বসভায় যাচ্ছে, কিন্তু দেখানোর জন্য নয়; প্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়া, বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং দেশের অবস্থান স্পষ্ট করাই হবে সফরের মূল লক্ষ্য।

 

প্রধানমন্ত্রীর সফরের এই সংক্ষিপ্ততা রাষ্ট্র পরিচালনায় কৃচ্ছ্রসাধনের বৃহত্তর নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকারি ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমানো এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে সরকার।

 

প্রধানমন্ত্রীর নিজের জীবনযাপন ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে ব্যয়সংযমের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুপুরের খাবার ও নাশতায় ব্যয়সীমা নির্ধারণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ—এসবকে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

 

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের একটি প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যদি সরকারি অর্থের ব্যবহারকে সীমিত ও প্রয়োজনভিত্তিক রাখেন, তাহলে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও একই ধরনের ব্যয়সংযমের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে জাতিসংঘ সফরের মতো আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতেও প্রয়োজন ও ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পায়।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন এক সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন দেশের অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে ছিল। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

 

দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

 

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের কয়েক মাসের তুলনায় কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ—এ বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

 

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

 

দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। অনেক শিল্পকারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি। বিদ্যুৎ খাতেও জ্বালানি সরবরাহের সংকট বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

 

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় একাধিক ধাপে বিপুলসংখ্যক নতুন গ্যাসকূপ খনন ও পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

 

পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে একাধিক এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ।

 

চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পেও বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

বিদ্যুৎ খাতে কারিগরি ত্রুটি দূর করে উৎপাদন বাড়ানো, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে পর্যায়ক্রমে সৌরশক্তিতে রূপান্তর এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

 

অর্থাৎ জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি বহুমুখী জ্বালানি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।

 

দেশের অর্থনীতির প্রাণ বেসরকারি খাত। শিল্পকারখানা চালু না হলে কর্মসংস্থান বাড়বে না, উৎপাদন বাড়বে না, রাজস্ব আয়ও বাড়বে না। এ কারণে বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রী শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের সমস্যাগুলো সরাসরি শুনছেন। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ঋণ, বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা এবং ব্যবসার পরিবেশ—এসব বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

 

শিল্প খাত সচল হলে এর প্রভাব শুধু উদ্যোক্তাদের ওপর পড়ে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে লাখ লাখ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার। একটি কারখানা চালু হওয়ার অর্থ নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া; উৎপাদন বাড়ার অর্থ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়া; আর বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি হওয়া।

 

এই বাস্তবতা বিবেচনায় বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও সরকারের উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের আরও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

 

এর লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়; কৃষক, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর মধ্যে আনা।

 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়া এবং সে অনুযায়ী নীতি নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

 

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চালুর উদ্যোগও বর্তমান সরকারের বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য যেমন আর্থিক চ্যালেঞ্জ, তেমনি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রতিটি খাতকে আরও কার্যকর করার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণে কৃচ্ছ্রসাধন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি তাই পরস্পর সম্পর্কিত।

 

দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতি অল্প সময়ে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। অর্থনীতি, জ্বালানি, শিল্প, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে সময় প্রয়োজন। তবে সরকারের দাবি, সাত মাসের মধ্যেই এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

 

এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের বার্তা নিয়েই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা। সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার সুযোগ থাকবে।

 

জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়ন, মহামারি প্রতিরোধ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হবে।

 

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটিাধিক আলোচনা ও পার্শ্ব বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং এই সংকটের আন্তর্জাতিক সমাধানের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, জাতিসংঘের অধিবেশন তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।

 

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে।

 

পাকিস্তান, কানাডা, থাইল্যান্ড, ভুটান, ক্রোয়েশিয়া, কুয়েত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

 

এসব বৈঠকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বিনিময় নয়; বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বাস্তব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে নিউইয়র্ক সফরটি বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব হয়ে উঠতে পারে।

 

সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উপস্থিতিকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে কার্যকর কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা।

 

একসময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সঙ্গে বড় বহর, দীর্ঘ সফর এবং নানা আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি আলোচনায় থাকত। এবার সেই জায়গায় প্রয়োজনীয় প্রতিনিধিদল, সংক্ষিপ্ত সফর এবং নির্দিষ্ট কূটনৈতিক কর্মসূচিকে সামনে আনা হয়েছে।

 

দেশের ভেতরেও একই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার—রাষ্ট্রীয় অর্থ সীমিত, তাই তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ জনগণের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য।

 

জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন, সেটি হবে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা একটি দেশ। যে দেশ অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে, শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে।

 

সাত মাসে দীর্ঘদিনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি নতুন পথরেখা তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজে লাগানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী সেই বাংলাদেশের কথাই বিশ্বসভায় তুলে ধরবেন—যে বাংলাদেশ সংকটকে অস্বীকার না করে তা মোকাবিলা করতে চায়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমাতে চায় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে সামনে এগিয়ে যেতে চায়।

 

বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের এই নতুন বার্তার মূল সুর হতে পারে—সফর হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ব্যয় হবে জনস্বার্থে এবং কূটনীতির প্রতিটি উদ্যোগের কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশ।