অন্ধকারের যাত্রী থেকে আলোর দিশারী: শিক্ষক আল আমিনের অদম্য গল্প।
অন্ধকারের যাত্রী থেকে আলোর দিশারী: শিক্ষক আল আমিনের অদম্য গল্প।
বান্দরবান প্রতিনিধি: সুকেল তঞ্চঙ্গ্যা।
পাহাড়ি জনপদ লংগদুর প্রত্যন্ত আটারকছড়া (করল্যাছড়ি) এলাকার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এক অসাধারণ মানুষের নাম সহকারী অধ্যাপক আল আমীন, যার জীবনের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে আছে সংগ্রাম, ধৈর্য্য আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প।
আল আমীন সাহেবের শৈশব ছিল সংগ্রামের রঙে আঁকা এক জীবন্ত গল্প। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই তিনি তার বাবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবনযুদ্ধের ভার বহন করেছেন। নিজের পড়াশুনা চালিয়ে নিতে কখনো তিনি নিজেদের জমিতে হাড় ভাঙা পরিশ্রমকরেছেন, কখনো আবার বাবার ছোট্ট দর্জির দোকানে বসে বাবাকে সহোযোগিতা করেছেন। আল আমীন সাহেবের জীবনে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তার জীবনে এমন অনেক সকাল কেটেছে, যখন পেটে একমুঠো ভাতও জোটেনি। সকালে স্কুল কিংবা কলেজে যাওয়ার সময় মায়ের মমতামাখা সান্ত্বনা “বাবা, স্কুল থেকে এসে খেয়ো, এখন ভাত নেই” এই কথাটুকুই ছিল তাঁর পথচলার শক্তি। মায়ের কথার সেই শক্তিকে পুঁজি করে, না খেয়েই চোখে স্বপ্ন নিয়ে পায়ে হেঁটে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতেন। ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে দেখতেন, ঘর এখনো শূন্য বাবা বাজার থেকে চাল আনতে পারেননি।
আল আমীন সাহেব অর্থভাবে কখনোই স্কুল কলেজের দুর্বল বিষয়গুলোতে বাড়তি যত্ন নিতে প্রাইভেট পড়তে পারেনি। এক কথায় বলতে গেলে তার শিক্ষাজীবন দারিদ্র্যের কঠিন বেড়াজালে আটকে থাকলেও তিনি কখনোই থেমে থাকেন নি। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে নিরবে এগিয়ে গেছেন। করল্যাছড়ি এলাকা হতে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে, প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার হেঁটে তিনি যাতায়াত করেছেন উপজেলার একমাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাবেতা মডেল কলেজে। ক্লান্ত শরীর, শূন্য পেট আর হাজারো সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গী করেও তাঁর চোখে ছিল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের এক অটল স্বপ্ন। তার এই নিরন্তর সংগ্রাম, ত্যাগ আর অদম্য অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে আল আমীন সাহেবের জীবন। শেষ পর্যন্ত তিনি সত্যি প্রমাণ করেছেন, অভাব নয়, ইচ্ছাশক্তিই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মানুষ সাধারণত সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে গেলে অতীত ভুলে যায়, কিন্তু আল আমীন সাহেব সেই সব মানুষদের মত নন, তিনি সত্যি আলাদা, যিনি সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়েও ভুলে যাননি তাঁর অতীত শিকড়, তাঁর পথচলার প্রতিটি সংগ্রাম আর কষ্টের গল্প। “ভয়েস অব লংগদু” সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী অনলাইন কমিউনিটির পক্ষ থেকে “অনুপ্রেরণার গল্প | লংগদুর কৃতি সন্তানের পথচলা” নামক কলামে তাঁর জীবনের গল্প ধারণ করতে গিয়ে এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হতে হয়। কোন প্রকার দ্বিধা সংকোচ ছাড়াই তিনি তার জীবন সংগ্রামের গল্প অকপটতায় বলে গিয়েছেন। এবং কথার ফাঁকে কখনো কখনো থেমে গিয়েছেন, পুরনো দিনের কথা মনে করে অশ্রু সিক্ত হয়েছেন, টিস্যুতে চোখ মুছেছেন। বিশেষ করে যখন তিনি তাঁর মমতাময়ী মা এবং মাতৃতুল্য বড় বোনের কথা বলতে শুরু করেন, যাঁরা তাঁর জীবনের কঠিন সময়গুলোতে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তখন সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে আরও হৃদয়বিদারক। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, নিরবে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে। কারণ, যাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, ত্যাগ আর দোয়া তাকে আজকের এই উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে তাঁরাই আজ বেঁচে নেই তাঁর সাফল্য দেখার জন্য।
আল আমীন সাহেব ১৯৯৩ সালে করল্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের সূচনা করেন। এরপর ১৯৯৭ সালে তিনি করল্যাছড়ি রশিদ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হোন এবং সেখান থেকে ২০০৩ সালে এসএসসি পাশ করেন এবং একই বছর ভর্তি হোন লংগদু উপজেলার এক মাত্র উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাবেতা মডেল কলেজে (বর্তমানে লংগদু মডেল ডিগ্রি কলেজ) এবং সেখান থেকে ২০০৫ সালে সফলতার সাথে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ২০০৬-০৭ সেশনে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সরকারি হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজের অর্থনীতি বিভাগে। সেখান থেকেই তিনি ১ম বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষা শেষে আল আমীন সাহেব এর পথচলা এখানেই থেমে থাকেনি, বরং তার লক্ষ্য ছিল আরও বড়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) এ যোগদান করা এবং দেশের একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করা। এবং সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে শুরু হয় তার কঠোর পরিশ্রম ও সুদীর্ঘ প্রস্তুতি। তিনি প্রথমে ৩৪ তম বিসিএসে অংশগ্রহণ করেন, প্রথম বার কাঙ্ক্ষিত সফলতার দেখা না মিললেও তিনি দমে যাননি বরং অধিক মনোবল এবং নিজের প্রতি প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে ৩৫ তম বিসিএসে অংশ নিয়ে কাংখিত সাফল্য অর্জন করেন। বিসিএস এছাড়াও একই বছর তিনি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এনবিআর, নন-ক্যাডার) এবং উপজেলা সহকারী ডাক কর্মকর্তা হিসেবেও মর্যাদাপূর্ণ সরকারি চাকরিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এবং পরবর্তীতে পেশা হিসেবে তিনি তার স্বপ্নের বিসিএস (শিক্ষা) কে বেছে নিয়েছেন।
আল আমীন সাহেব বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে বান্দরবান সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাপ্ত হয়ে সরকারি হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রামে পদায়ন হোন। বর্তমানে তিনি তার প্রিয় বিদ্যাপীঠ সরকারি হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন এবং জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলছেন।
পারিবারিক পরিচয়ে, আল আমীন অত্র উপজেলার আটারকছড়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের করল্যাছড়ি গ্রামের এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোঃ ইউনুস সাহেব এবং মাতার নাম মরহুমা লাইলি আকতার । তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পরিবারের মেঝো। ২০১১ সালে অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি তাঁর মাকে হারান। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন হয়ে ওঠেন তাঁর বড় বোন, যিনি স্নেহ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণার তাঁকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, মায়ের মতো করে ভাইয়ের সাফল্য দেখে যেতে পারেননি সেই বড় বোন, ২০১৪ সালে তিনি পরলোকগমন করেন। আল আমীন সাহেব এর বাবা মোঃ ইউনুস সাহেব প্রকাশ ইউনুস খলিফা করল্যাছড়ি বাজারের একজন সুপরিচিত ও পরিশ্রমী দর্জি ছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ওই বাজারে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে সংসার পরিচালনা করেছেন। অজপাড়া গ্রামের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে সংসার চালিয়েছেন এবং সন্তানের শিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। পিতার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ এবং মরহুমা মায়ের নিঃস্বার্থ দোয়া ও অনুপ্রেরণাই আল আমীনের জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে।
বর্তমানে আল আমীন সাহেব শিক্ষা জীবনের অসামান্য সাফল্য পেড়িয়ে কর্মজীবনেও কর্মস্থলের অগনিত দরিদ্র শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগত ভাবে বিনা বেতনে পড়ানো, পাঠ্য পুস্তক সহায়তা সহ অনুপ্রেরণা দিয়ে তাদের সাফল্যের পথে এগিয়ে নিচ্ছেন। এবং নিজ উপজেলার মানুষের কল্যাণেও তিনি সর্বদা নিবেদিতপ্রাণ। লংগদু উপজেলা জুড়ে মানবতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া উপজেলার সর্বপ্রথম স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক অনলাইন কমিউনিটি ‘ভয়েস অব লংগদু’-এর উপদেষ্টা পরিষদের সম্মানিত উপদেষ্টা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। উপজেলার অসহায় অসুস্থ ও আর্তপীড়িত মানুষের কল্যাণে সংগঠনকে সুষ্ঠ সুন্দর ভাবে পরিচালনার লক্ষে দিচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা।
আল আমীন সাহেবের জীবনের গল্প আমাদের শেখায়, অজপাড়া গাঁ থেকে উঠে এসেও আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখা যায়, কঠিন বাস্তবতার মাঝেও সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়, আর ধৈর্য্য, পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবল থাকলে সফলতা একদিন আসবেই। তার এই জীবনযুদ্ধ তরুণ প্রজন্মের জন্য তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।


আপনার মতামত লিখুন
Array