প্রাকৃতিক দুর্যোগে রোয়াংছড়িতে পর্যটন বিপর্যয়: চরম খাদ্য সংকটে শতাধিক গাইড ও মাঝি, দেখা মেলেনি সরকারি সহায়তার।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে রোয়াংছড়িতে পর্যটন বিপর্যয়: চরম খাদ্য সংকটে শতাধিক গাইড ও মাঝি, দেখা মেলেনি সরকারি সহায়তার।
রোয়াংছড়ি,সংবাদদাতা: চিংনুমং মারমা।
টানা কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ এবং তৎসৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার পর্যটন সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী মানুষের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় উপজেলার শতাধিক পর্যটক গাইড, নৌকাচালক ও স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিকেরা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দুর্যোগের বেশ কয়েক দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ত্রাণ কিংবা কার্যকর কোনো সহায়তার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসের ফলে অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক মানুষ। আচমকা এই বেকারত্বের ফলে পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক গাইড ও শ্রমিকের পরিবার শিশু, নারী ও বৃদ্ধ সদস্যদের নিয়ে চরম দুর্ভোগ ও নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছেন।
উপজেলার অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ ‘দেবতাখুম’-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্থানীয় অর্থনীতি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বন্যার তীব্র স্রোতে পর্যটকদের পারাপারের জন্য ব্যবহৃত ৮টি নৌকা এবং ৭০টি বাঁশের ভেলা ভেসে গেছে। প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, এতে প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসন আগামী ২০ জুলাই পর্যন্ত দেবতাখুমে পর্যটক ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, ২০ তারিখের পর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও ভেসে যাওয়া সরঞ্জাম ও নৌযানের অভাবে আগত পর্যটকদের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে কিনা, তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। ফলে এই স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার রূপ নিতে যাচ্ছে।
রোয়াংছড়ি উপজেলা টুরিস্ট গাইড কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি চিংনুমং মারমা সংকটের তীব্রতা প্রকাশ করে বলেন।
“ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল আমাদের গাইড ও মাঝিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। একে তো উপার্জনের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ, তার ওপর অনেকের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই মুহূর্তে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ত্রাণ সহায়তা প্রদান করা না হলে এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, দুর্যোগের এতগুলো দিন পার হয়ে গেলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্ধার তৎপরতা কিংবা মানবিক সহায়তা পৌঁছায়নি।
উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতিতে মানবিক বিপর্যয় এড়াতে এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে সরকারের উচ্চপর্যায় ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং দ্রুত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা এবং কর্মহীন শ্রমিকরা।


আপনার মতামত লিখুন
Array